অজানা গন্তব্য…পথ…পথচারী এবং আমি…

Standard

অন্তহীন এক অজানা গন্তব্যের দিকে পথ হেঁটে চলেছি সেই ছোট্টবেলা থেকে… হাঁটতে হাঁটতে কতবার যে হোঁচট খেয়েছি তা গুণে রাখার মত সামর্থ্য আমার ছিল না। পথিমধ্যে হয়তো অনেক জায়গাতেই খানিকটা বিশ্রাম নিয়েছি, এরপর পুরো উদ্যমে আমার হেঁটেছি। যখনি প্রয়োজন মনে করেছি খানিকটা জিরিয়ে নিয়েছি। পথ চলতে চলতে অনেক পথচারীরই দেখা পেয়েছি, তাদের কেউ হয়তো আমাকে আপন করেছে, কেউ হয়তো দূরে ঠেলে দিয়েছে। কেউ হয়তো কোনটিই করার সময় পায়নি, স্বেচ্ছায় তাদেরকে আপন করে নিয়েছি। হয়তো নিজের তাগিদে, হয়তো তাদের তাগিদে…

অজানা গন্তব্য

সকলে সমান তালে পথ চলতে পারে না, ঠিক তেমনি ভাবে আমিও হয়তো অনেক পথিকের সাথে সমান তাল বজায় রাখতে পারিনি; তাই হয়তো তারা আমাকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে পিছে ফেলেই ছুটেছে অন্তহীন অজানায়। একবারও পিছে ফিরে তাকায়নি, পাছে লজ্জায় পড়ে যায় এই ভেবে। আমি কিছু বলেনি, শুধু তাদের চলে যাওয়া ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে দেখেছি। হয়তো অস্বাভাবিক এই চাহনির মাঝে কখনো চোখের কোণে জমাট বেঁধেছিল অশ্রুকণা, বেশ খানিকটা কণা এক হয়ে যখন গড়িয়ে পড়ার আকুল চেষ্টা চালাচ্ছিল, এই আমি তখন সেগুলোকে ধরে রাখার ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালাচ্ছিলাম।

ছোটবেলা থেকেই ডানপিটে ছিলাম, কিন্তু ডানপিটে ছেলেদের একটা স্বভাব মিসিং ছিল আমার মধ্যে। আমি মানুষটা খুব বেশিই ইমোশনাল। হয়তো অনেকের কাছেই এটা উপরিভাব হিসেবে ধরা দেয়… কিন্তু যারা চেনার তারা ঠিকই চিনে নেয় কোনটা আসল ইমোশন আর কোনটা ফেইক…

যারা আমাকে ঠেলে সরিয়ে আগে চলে গেল তাদের দেয়া ব্যথার ক্ষত যে শুকানোর নয়… তবুও নানানভাবে ব্যথাগুলোকে দমিয়ে রাখার অপচেষ্টা করতাম, এখনো করি। মাঝে মাঝে মনে হতো হয়তো ভুলে গেছি পুরনো ব্যথাগুলো, মনে মনে খানিকটা আনন্দও লুটে নিতাম এই ভেবে। কিন্তু হায়! সময়মত ঠিকই মাথাচাড়া দিয়ে উঠত বেয়ারা দুঃখগুলো। কেন যে প্রিয় মুখগুলোর দেয়া দুঃখ এতোটা বেয়ারা হয় ভেবে পাই না…

জীবনে যে থেমে থাকার কোন সুযোগ নেই, তাই আবার সেই দুঃখের বোঝা কাঁধে নিয়ে হাটা শুরু করি, আবার হয়তো কেউ একইরকম বা তারচেয়েও বেশি কিছু দুঃখ দিয়ে আমার বোঝাটাকে আরেকটু ভারী করে দেয়। আমার ধারণা এর মধ্যে বেশ আনন্দ আছে, নইলে কেন মানুষগুলো এমন করবে? আশা ছিল হয়তো আমিও কোনদিন মানুষের ঘাড়ে দুঃখের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে চলে যাবো আর মজা লুটবো। বেশ কষ্ট হয় দুঃখগুলো নিয়ে হাঁটতে। সবসময়ই চাইতাম এমন কেউ হয়তো আসবে যাকে পথিমধ্যে কিছুটা দুঃখ চাপিয়ে দিয়ে নিজের বোঝা কমিয়ে নিবো। কিন্তু সেই সৌভাগ্য আজও হলোনা।

চলতে চলতে অনেক পথচারীকেই আপন করার চেষ্টা করেছি, হয়তো পেরেছিও অনেককে। কখনো কতকগুলো পথচারীর মাঝে বিনা অনুমতিতে নিজের অবস্থান করে নেয়ার চেষ্টা-অপচেষ্টা সবই করেছি। আশা করেছিলাম, এরা আমার দুঃখগুলো না বয়ে দিক, শুধু আমাকে খানিকটা সুবিধে দিয়ে দুর্গম পথটাকে সুগম করে দিবে। দেয়নি এমনটা বলে নিজেকে মিথ্যেবাদী বানাতে মোটেও ইচ্ছুক নই, দিয়েছে; অনেকেই চলার পথ সুগম করে দিয়েছে। এদের মধ্যে কেউ হয়তো একান্তই আমার দুঃখের কথা চিন্তা করে সাহায্যে এগিয়ে এসেছে, কেউ হয়তো একান্তই তার নিজের স্বার্থ সিদ্ধির জন্যে এসেছে। আমি দুই দলের লোককেই আপন করে নিয়েছি। দুধের মাছিও যদি সুসময়ে দুধে এসে চুমুক দিয়ে বুঝিয়ে দেয় যে দুধে বিষ আছে না নেই, তাতে দোষ কি?

জীবন একটা বাঁশ বাগান, যেখানে শুধু বাঁশ আর বাঁশ। কত রকমের বাঁশ যে আছে জানা নেই। আমি স্বল্প-জ্ঞানী, বাঁশ বলতে দু’রকম বাঁশই বুঝি। ছিলা বাঁশ আর আছিলা বাঁশ… কোনটার স্বাদ কিরকম সে নাহয় নাই বললাম।

আমি মানুষটা অনেক খারাপ, তাইতো কেউ চিনতেই পারলো না আমাকে, যারা চিনেছে তারাও হয়তো অন্তহীন পথ পাড়ি দেয়ার জন্যে ভুলে গেছে আমি কে… আমাকে কোন প্রয়োজন আছে তাদের? কখনো ছিল? কখনো হবে? আমি প্রতিটি মানুষকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেখিয়ে বলতে পারব সে কেন আমার সাথে পথ চলতে এসেছে। তবুও থাক, সেইরকম কাজ নাইবা করি। এতে হয়তো কিছু সঙ্গী পথচারীর সংখ্যা বাড়বে। হয়তো এদের মধ্যেই কেউ কোনদিন আমাকে পুরোপুরি চিনে নিতে সমর্থ হবে, তখন আরেকজন ভালো পথচারী পেয়ে যাবো যে আমার দুঃখের বোঝাটাকে বয়ে নিতে খানিকটা হাত লাগাবে।

কয়েকজন সঙ্গী পথচারীকে সময়ের সাথে সাথে আরও আপন করে নিয়েছি, আমার হ্রদয়ে তাদের অবস্থান আরও দৃঢ় করেছি, খুঁটি গেড়ে দিয়েছে যাতে চাইলেও সে মুছে যেতে না পারে মন থেকে। অনেকেই হয়তো এর মর্ম বুঝবেনা, বোঝার কোন প্রয়োজনই নেই। শুধু খানিকটা আমার মর্ম বুঝলেই আমি ঢের খুশি থাকবো। তারা হয়তো কল্পনাও করতে পারবেনা একজন সঙ্গী পথচারীকে আমি কতটা আপন ভাবতে পারি… আমি তাদেরকে ঠিক ততটাই আপন মনে করি যতটা আপন মনে করলে কেউ কাউকে বিনিময় ছাড়া কিছু দিতে পারে, যতটা আপন মনে করলে তাদের খুশিতে খুশি হতে পারে, যতটা আপন মনে করলে তাদের দুঃখে দুঃখী হতে পারে, ঠিক যতটা আপন মনে করলে তাদের সামান্য ব্যথায় বুকের ভিতরটা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়, ঠিক যতটা আপন মনে করলে একটা মানুষ খারাপ পথ থেকে সরে আসে, ঠিক যতটা আপন মনে করলে তাদের জন্যে মনে ভালোবাসা জন্ম নেয়…

আমার ধারণা, কিছু সঙ্গী পথচারী পেয়েছি যারা হয়তো কখনোই ছেড়ে যাবে না। তাদেরকে অনেক ভালোবাসি… তারা আমাকে চিনতে পেরেছি কিনা এখনো জানিনা, শুধু এটুকু জানি, সময় তার অনবরত পথচলায় অনেক মানুষকেই ভুলিয়ে দেয়, কিন্তু আমি এমন কিছু মানুষ পেয়েছি যাদের সান্নিধ্য সময়কেই ভুলিয়ে দেয়…

Advertisements

9 thoughts on “অজানা গন্তব্য…পথ…পথচারী এবং আমি…

  1. ঘুরতে ঘুরতে চলে আসলাম… আর এসেই এত ভাবপূর্ণ একটা লেখা পড়বো ভাবতে পারি নাই। অসাধারণ তোমার লেখার হাত। চালিয়ে যাও। মনের অন্তস্থল থেকে অনেক দোয়া রইলো, জীবনে অনেক বড় হও।

    আমি আত্বকথা লিখতে পারিনা। তবে তোমার সাথে আমার মিল আছে…

    • স্বাগতম সুমন ভাই… আপনার কাছে আমি অনেকাংশেই কৃতজ্ঞ… কেন পারবেন না? অবশ্যই পারবেন… আপনি চাইলেই পারবেন, লিখে ফেলুন না সময় করে মাঝে মাঝে… মনের কিছু কথা সবার সাথে শেয়ার করলে নিশ্চয়ই অনেক ভালো লাগবে…

  2. Ariful Islam Shaon

    আমি তাদেরকে ঠিক ততটাই আপন মনে করি যতটা আপন মনে করলে কেউ কাউকে বিনিময় ছাড়া কিছু দিতে পারে, যতটা আপন মনে করলে তাদের খুশিতে খুশি হতে পারে, যতটা আপন মনে করলে তাদের দুঃখে দুঃখী হতে পারে, ঠিক যতটা আপন মনে করলে তাদের সামান্য ব্যথায় বুকের ভিতরটা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়, ঠিক যতটা আপন মনে করলে একটা মানুষ খারাপ পথ থেকে সরে আসে, ঠিক যতটা আপন মনে করলে তাদের জন্যে মনে ভালোবাসা জন্ম নেয়… 🙂

আপনার মতামত জানানঃ

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s